Thappad: সমাজ, আমরা এবং “সির্ফ এক থাপ্পড়”

সিনেমাঃ Thappad ( থাপ্পড় )

পরিচালকঃ অনুভব সিনহা

চিত্রনাট্যঃ Mrunmamayee Lagoo

গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রঃ তাপসী পান্নু, দিয়া মির্জা, পাভেল গুলাটি, মায়া সারাও

প্রযোজক সংস্থাঃ ভূষণ কুমার, T-Series

এই সিনেমাটি মূলত সমাজের সেই কুৎসিত চরিত্রের কথা বলে, যেখানে জন্মের পর থেকেই একটি মেয়েকে তোতাপাখির মতো শেখানো হয় তুমি মেয়ে, তোমাকে মানিয়ে নিতে শিখতে হবে, তোমাকে সহ্য করতে জানতে হবে, তোমাকে ধরে রাখতে শিখতে হবে। মূলত একটি মেয়ের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি অর্থাৎ, জীবনযাপন সবই নির্ভর করে তার সমাজের গঠন, কাঠামো এবং প্রকৃতির উপর। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন মেয়ের জন্ম মানেই পরিবারের ভয় ও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা। ছোট থেকে  বড় হওয়া অবধি পরিবার ও সমাজ জাহির করতে থাকে মেয়ে মানেই দুর্বল এবং এই চিন্তাবোধ যা তার মস্তিষ্কে ধুঁকিয়ে দেয়া হয় তা তাকে পরনির্ভরশীল করে তোলে। তেমনি এই ছবিতেও দেখা যায় ঐ চিন্তাবোধ প্রধান চরিত্র অমৃতার নৃত্য শিল্পী হয়ার বাসনাকে পিষ্ট করে দক্ষ গৃহিণী হবার ঘোরে আবদ্ধ করে। সময়ে সময়ে কিছু ছবি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের নারীদের বঞ্চনার কথা বলে, লাঞ্ছনার কথা বলে। নীরাবতার প্রতীকী প্রতিবাদ ও সংগ্রামকে প্রগতিশীল ও সাহসের সাথে এই সমাজে তুলে ধরে।

সিনেমাটিতে দিল্লির এক মধ্যবিত্ত দম্পতির সাংসারিক জীবনে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পুরুষতান্ত্রিক আচরণ যেগুলো এই সমাজ এড়িয়ে যেতে শেখায় সেগুলো উঠে এসেছে। যেখানে স্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন স্বামী তার স্ত্রীকে থাপ্পড় মারতে পারেন কি না? মূলত প্রশ্নটি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি, গোটা সমাজব্যবস্থার প্রতি।  এটি একটা নারীবাদী সিনেমা। তবে পুরুষবিদ্বেষী নয়। মেয়ের প্রতি অমৃতার বাবা সমর্থন দেখিয়ে অনুভব সিনহা সূক্ষ্মভাবে সেই প্রাসঙ্গিক বিষয়টির দিকেও নির্দেশ করেছেন। কাজেই একবারের জন্যেও মনে হয়নি এখানে পুরুষদের কোনো ভাবে জোর পূর্বক ছোট করার চেষ্টা করা হয়েছে। বরং তিনি দেখিয়েছেন কেবল পুরুষ নয় স্বয়ং নারীরাও এর জন্য দায়ী।

সিনেমায় অমৃতার চরিত্রে তাপসী পান্নু ও তার স্বামী বিক্রম চরিত্রে পাভেল গুলাটি অভিনয় করেন। বিক্রম একটি কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকুরি করেন। কোম্পানিতে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করে আমেরিকায় যাবার স্বপ্ন দেখেন এবং একদিন যোগ্যতার গুণে সেই সুযোগও পেয়ে যান। এই খুশিতে বাড়িতে পার্টির আয়োজন করেন বিক্রম। পার্টি চলাকালীন মুহূর্তে বিক্রম জানতে পারে আমেরিকায় তাকে অন্য একজনের অধীনে কাজ করতে হবে যা তিনি মেনে নিতে পারেন নি। এই নিয়ে পার্টিতে উপস্থিত সহকর্মীর সাথে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে অমৃতা থামাতে আসলে বিক্রম তাকে থাপ্পড় দিয়ে বসেন। আর এখান থেকেই গল্পে একজন নারী তথা অমৃতা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আর যাই হোক, তার স্বামী গায়ে হাত তুলতে পারেন না। সে অনুধাবন করে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে সে কোন সম্মান পাচ্ছে না। অথচ তারা ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলো। সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে তাপসী বা অমৃতার একটা সংলাপ যা বারেবারে ঘুরেফিরে এসেছে ছবির বিভিন্ন মুহূর্তে, অমৃতা বলেছেন,

“সির্ফ এক থাপ্পড়? নেহি মার সকতা!”

অনেকে মনে করতে পারে একটা থাপ্পড়ে কি এমন এসে যায়। একটা থাপ্পড়ের কারণে একটা সংসার তো আর ভেঙ্গে যায় না। পরিবারে এক আধটু ঝগড়া জাটি তো হতেই পারে এগুলোকে মানিয়ে চলতে হয়। যেখানে স্বামীর কাছে শুধুমাত্র একটা থাপ্পড়কে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চান না স্বয়ং নারীরাই। বস্তুত এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমাজব্যবস্থার ফসল। একটা থাপ্পড় তো হতেই পারে এমন কথা বাস্তবে আমরা অনেকেই শুনে অভ্যস্থ। কিন্তু এই সয়ে যাওয়া এবং মেনে নেয়ার ফলাফল বাস্তবে ভয়াবহ। উদাহরণস্বরূপ বলে রাখা ভালো, ২০১৮ সালে ডয়েচ বাংলা নারী নির্যাতনের উপর ব্র্যাকের এক গবেষণা প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয় বাংলাদেশে শতকরা ৮২ ভাগ বিববাহিত নারী নির্যাতনের শিকার হন৷ এই গবেষণায় ২০১৭ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়৷ এই রিপোর্ট অনুযায়ী বিবাহিত নারীরাই নির্যাতনের শিকার হন বেশি৷ যার মধ্যে শতকরা ৬১ ভাগ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন৷ দুঃখ জনক হলেও এই রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায় শতকরা ৭৭ ভাগ নারী তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতেই নির্যাতনের শিকার হন৷

কিছু সিনেমায় সিনেমাটোগ্রাফি, অভিনয়, সম্পাদনা, আবহ সঙ্গীত সবকিছু ছাপিয়ে সামনে আসে লেখনী ও সংলাপ। খুব কম সিনেমায় কলাকুশলীদের অভিনয় দর্শককে ওতপ্রোতভাবে চরিত্রদের জগতে হারিয়ে যেতে দেয়। নির্মাতা অনুভব সিনহা সমাজের ট্যাবুই যেন অঙ্গুলি দিয়ে এই সিনেমায় দেখিয়ে দিয়েছেন।

এই সিনেমায় অমৃতা ছাড়াও আর ছয়টি নারী চরিত্র আছে। প্রত্যেকটি নারী চরিত্রকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা কোনো না কোনো ভাবে সেক্সিজমের থাবায় পিষ্ট। এদের মধ্যে অমৃতার মা যে ছেলে মেয়ে কে বড় করতে গিয়ে নিজের গায়িকা হবার স্বপ্ন কে অঙ্কুরেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। তার শাশুড়ি যে কিনা নিজের স্বামী সংসার সামলাতে সমালাতে শেষ বয়সে ছেলের ঘরে এবং নিজের বলতে কিছু নেই। অমৃতার ভাইয়ের বউ সবে উকালতি পেশায় নিজেকে জড়িয়েছেন। তাকেও দিন শেষে স্বামী ও শ্বশুরের কাছ থেকে একটু গুনগ্রহিতার আশায় বসে থাকতে হয়। কেননা সিনেমায় দেখা যায় তার স্বামী অমৃতার ভাই হওয়া সত্ত্বেও পৌরোষিক অহংবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। অমৃতার পাশের ফ্লাটে থাকেন সিভানি চরিত্রে দিয়া মির্জা । যিনি একজন বিধবা মা এবং সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে যে সমাজের পুরুষতান্ত্রিক চক্ষুর রোষানলে পড়তে হয় তার প্রমাণ মেলে বিক্রমের মনে যখন প্রশ্ন আসে এই মহিলা কি করে যে এত বড় দুই দুইটা মার্সিডিজ গাড়ির মালিক হতে পারেন। সিনেমায় উকিলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মায়া সারাও ।  সিনেমায় তার চরিত্রের নাম নেত্র। নামী উকিল হয়েও তাকে প্রতিনিয়ত শুনতে হয় তার স্বামী ও শশুরের প্রতিপত্তির কারনেই তার নাকি এতো খ্যাতি। এছাড়া আর এক নারী চরিত্রে রয়েছে অমৃতার বাসার কাজের মেয়ে যাকে তার স্বামী সারাক্ষণই কারণে অকারণে মারতেই থাকে। মূলত এই চরিত্রটি মধ্য দিয়ে নির্মাতা অনুভব সিন্‌হা সমাজের খেটে খাওয়া অশিক্ষিত কিংবা সল্প শিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণী ও শিক্ষিত পুঁজিবাদী  সমাজের মজ্জায় মজ্জায় যে নারী নির্যাতনের বিষ ঢুকে গেছে তা স্পষ্ট করেছেন।

অনুভব সিনহা সূক্ষ্মভাবে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর দিকে নির্দেশ করে দেখিয়ে দিয়েছেন আপাত দৃষ্টিতে সুখের সংসারে কতোটা সেক্সিজম চলছে। তাপসী পান্নু অভিনয়ে কতটা দক্ষ তার প্রমাণ ইতোমধ্যে বিগত PINK, GAME OVER বা MANMARZIYAN এর মতো সিনেমা গুলোতে তিনি দিখিয়েছেন। থাপ্পাড় সিনেমাতেও তার চেষ্টার কমতি ছিল না বরং বলতে হয় তিনি সফল।

বস্তুত ‘থাপ্পাড়’ সিনেমাতে একটা থাপ্পড়কে কেন্দ্র করে সমাজের যে কুৎসিত চেহারাটা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বিশেষত বাংলাদেশের পরিস্থিতিও একই। ভারতের সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যটা কেবল দেশ দুইটির নাম, প্রধান ধর্ম ও রীতির পার্থক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশের এমন পরিবারের সংখ্যা নগন্য যেখানে “আমার কাপড় টা ধুয়ে দাও, আমার চা টা বানিয়ে দাও” এরকম বাক্য মায়েদের শুনতে হয় নি। এমন বোন পাওয়া দুষ্কর যাকে শুনতে হয় নি পড়াশুনার পাশাপাশি রান্না টাও শিখে নিও। এসব ছোট ছোট বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই কেননা এইসব টুকরো টুকরো ছোট বিষয়ের মধ্য দিয়েই আমরা সেক্সিজমের চর্চা করি। যার ফলস্বরূপ থাপ্পড়  এর মতো এক একটি গল্প। এই সমাজের বহু পরিবর্তন ঘটলেও সারবস্তুতে নারী জীবনের মর্মবেদনা, বঞ্চনা ও লজ্জার অবসান এখনো ঘটেনি। পুরুষতন্ত্র, পশ্চাদপদ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীও ধারণাগুলো এদেশের সমাজের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত যা নারীকে এখনো ‘থাপ্পাড়’ ছবির চরিত্রগুলোর মতই তাড়িত করে। উপরোন্ত যখনই কোনও নারী মূল কাঠামোকে মানতে নাকচ করেন বা তাতে বিন্দুমাত্র আঘাত হানেন, তখনই সেই নারীকে অপদস্থ করতে তথাকথিত ‘আধুনিক’ শিক্ষিত মানুষেরাও সমাজের আরোপিত শিক্ষা ভুলে নিজেদের রুচি ও শালীনতার পরিচয় দেন। নারী কিংবা পুরুষ এই সমাজে কেউ সমানাধিকারের কথা বললেই নারীবাদী বলে তির্যক মন্তব্য করা হয়। সমাজের শুধু রক্ষণশীল মানুষই নন, বরং এক শ্রেণীর শিক্ষিত মানুষও মনে করেন নারীবাদীরা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। নারীবাদের প্রভাব নেতিবাচক যা মেয়েদের উশৃঙ্খলতার পথ দেখায়।

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভাঙতে হলে নারীদেরকেও জাগতে হবে। ’থাপ্পড়’ সিনেমাটির অমৃতা চরিত্র তারই প্রতিকী রূপ।

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারী সমাজের জাগরনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,

“ভগিনীগণ! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন- অগ্রসর হউন! বুক ঠুকিয়া বল মা, আমরা পশু নই। বল ভগিনী, আমরা আসবাব নই। বল কন্যে, আমরা জড়াউ অলংকার-রূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল, আমরা মানুষ।”

*Image Source: Pinterest / Bollywoodpapa.com

***পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।***

Content Protection by DMCA.com