- বিজ্ঞাপন -
33.9 C
Pirganj
প্রচ্ছদগল্পবাঙালির রেড জোন - রোহিত হাসান কিছলু

বাঙালির রেড জোন – রোহিত হাসান কিছলু

- বিজ্ঞাপন -

টিভিতে খবরটা দেখেই খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন সামাদ সাহেব। তারপর চিৎকার করে বাসার সবাইকে জানালেন, ‘অ্যাই তোমরা খবর দেখেছো? আমাদের এলাকাতো রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে!’

খবরটা শুনে সামাদ সাহেবের স্ত্রী দৌড়ে এলেন। ছুটে এলেন সামাদ সাহেবের ছেলে মেয়েরাও! সবাই টিভি সেটের সামনে হুমিড়ি খেয়ে আছে! টিভি স্ক্রলে সামাদ সাহেবের এলাকার নামটা আবার আসতেই সবাই একসাথে উল্লাস করে উঠলেন! সামাদ সাহেবের ছেলে বাবুল খুশিতে বলেই উঠলেন, ‘ইস! আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আমাদের এলাকা রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে! সামাদ সাহেবের মেয়ে ববি ফোন করলো তার বান্ধবীকে! তারপর বললো, ‘জানিস আমাদের এলাকা এখন রেড জোনে! তোরা কিসব গরিব এলাকায় থাকিস? ছিঃ ছিঃ!’

বাসায় বেশ উৎসবমুখোর পরিবেশ। সামাদ সাহেব তার স্ত্রীকে বললেন, ‘ফ্রিজে গরুর মাংস আছে?’
‘হ্যা আছে!’
‘পোলাওয়ের চাল আছে?’
‘হ্যা আছে!’
‘এক কাজ করো, তেহারি রান্না করে ফেলো! রেড জোন হওয়াটাকে একটু সেলিব্রেট করি!’
এমন সময় সামাদ সাহেবের মেয়ে বললো, ‘উহু বাবা! তেহারি না! খিচুড়ি আর গরুর মাংসের কালা ভুনা করে ফেলো! ইয়ে বাসায় দুই তিন পদের ডাল আছে তো?’
সামাদ সাহেবের স্ত্রী বললেন, ‘হুমমম ডালও আছে!’
সামাদ সাহেব এবার হাতে তুড়ি বাজিয়ে বললেন, ‘তাহলে খিচুড়ি আর গরুর কালা ভুনাটাই করে ফেলো! এদিকে আকাশটাও মেঘলা মেঘলা! বৃষ্টি আসবে! খিচুড়ির সাথে গরুর কালা ভুনা খুব জমবে! ইয়ে বাসায় খাঁটি ঘি আছে তো?’
‘হ্যা আছে!’
‘কাগজি লেবু আছে তো? খিচুড়ির উপর একটু কাগজি লেবু টিপে দিবো! স্বাদ বেড়ে যাবে! আহা!’
সামাদ সাহেবের স্ত্রী এবার মুখটা কালো করে বললো,‘ঘরে তো কাগজি লেবু নাই!’
সামাদ সাহেব সহ তার ছেলে মেয়ে এবার হায় হায় করে উঠলো! সামাদ সাহেবের ছেলে বাবুল তো মন খারাপ করে বলেই ফেললো, ‘কাগজি লেবু ছাড়া খিচুড়ি আর গরুর কালা ভুনা খাওয়া মানে পেঁয়াজ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া!’
সামাদ সাহেব দ্রুত শার্টটা গায়ে চড়িয়ে বললেন, ‘আমি কাগজি লেবু নিয়ে আসছি! তোমরা আয়োজন করতে থাকো!’

রেড জোন। এলাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাঁশ বেধে লকডাউন করা হয়েছে! সামাদ সাহেব সেই বাঁশের তলা দিয়ে বহু কষ্টে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন! একটা সময় সে পারও হয়ে গেল! পার হতেই দেখলেন পাশের ফ্ল্যাটের দেলোয়ার সাহেব লিচু গুণছেন! সামাদ সাহেব খুশি খুশি গলায় হাক দিলেন, ‘কী হে দেলোয়ার সাহেব? কী করছেন?’

দেলোয়ার সাহেব সামাদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘লিচু গুনছি! আর বলবেন না! লিচুওয়ালারা এক একটা বাটপার! গোনায় কম দিবেই! তাই নিজের লিচু নিজেই গুনে নিচ্ছি!’
‘এলাকাতো রেড জোনে পইড়া গেল! সেলিব্রেট করবেন না?’
‘আরে সেই জন্যেই তো লিচু কিনছি! এরপর আম কিনবো! তারপর জাম, সবশেষে কাঁঠাল! দেশি ফল দিয়ে দেশীয় কায়দায় রেড জোনে পড়াটা সেলিব্রেট করবো! আপনি কী করছেন?’
‘আমি খিচুড়ি ও কালা ভুনার আয়োজন করছি!’
‘খুব ভালো! এত এলাকার মধ্যে আমাদের এলাকাই রেড জোনে পড়লো! ভাবতে পারেন?’

দেলোয়ার সাহেবের লিচু গোনা শেষ। তিনি কাঁঠাল কিনতে বাজারের দিকে হাঁটা দিলেন! সামাদ সাহেবও কাগজি লেবু কিনতে তার সাথে চললেন! দুজনে কিছুদূর যেতেই দেখলেন পাশের বিল্ডিংয়ের বারেক সাহেবকে! তিনি পেঁয়াজ, বিটলবণ ও কাঁচামরিচ দিয়ে সিঙ্গারা খাচ্ছেন! সামাদ সাহেব ও দেলোয়ার সাহেবকে দেখেই ডাক দিলেন!
‘আরে ভাই, কই যান আপনারা? আসেন গরম গরম সিঙ্গারা, জিলাপি ও চা দিয়ে রেড জোন হওয়াটা সেলিব্রেট করি! ও খবর শুনছেন, আমাদের এলাকাতো রেড জোনে পড়েছে! খুবই ইজ্জতের সংবাদ!’
সামাদ সাহেব হাসি মুখে বললেন, ‘সেই জন্যেই তো বাইরে এসেছি! বাসায় আজ খিচুড়ি ও কালা ভুনা করা হবে!’
দেলোয়ার সাহেব বললেন, ‘আমি দেশী ফল দিয়ে দেশীয় কায়দায় সেলিব্রেট করবো!’
‘আসেন আগে সিঙ্গারা, জিলাপি ও চা দিয়ে সেলিব্রেট করি!’-বারেক সাহেবের দাওয়াতে দুজনেই দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লেন!
আস্তে আস্তে তাদের আড্ডায় যোগ দিলেন, জব্বর সাহেব, গুলজার সাহেব, রফিক সাহেব, আবুল সাহেব, বাতেন সাহেব সহ আরো অনেকে!’

খুব খাওয়া দাওয়া হচ্ছে! এমন সময় কাছে ধারে কোথাও পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল! সাথে সাথে সবাই পকেট থেকে মাস্ক বের করে পরে নিলেন! তারপর প্যান্টের পকেট থেকে পুরনো প্রেসক্রিপশন বের করে হাতে রেখে দিলেন! যাতে পুলিশ ধরলে লাঠির বাড়ি দেয়ার আগেই প্রেসক্রিপশনটা দেখানো যায়!

দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়ে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আবার বাঁশের গেটের তলা দিয়ে যে যার বাসায় ফিরে আসলেন! কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পেলেন না তারা তাদের পরিবারের জন্য একটা করে অদৃশ্য বাঁশও নিয়ে গেলেন! হ্যা, সেই বাঁশের নাম করোনা ভাইরাস!


ত্রিশটা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক, ক্যামেরা ম্যান ও তাদের গাড়ির ড্রাইভার সহ মোট নব্বই জন মানুষ বাঁশ দিয়ে আটকে রাখা রেড জোন এলাকার গেটের সামনে ওৎ পেতে আছেন! প্রিন্ট মিডিয়া ও অনলাইন মিডিয়া সহ আরো দুইশজন সাংবাদিকও তাদের সাথে আছেন! তাদের কাজ কারবার দেখতে আরো তিনশজন মানুষ এসে ভীড় করেছে!

সাংবাদিক সাহেবেদের লক্ষ্য একটাই, বাঁশের গেট কেউ টপকালে বা নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বের হলেই তাকে ধরে ইন্টারভিউ নিতে হবে! মানুষ এখন রেড জোনের নিউজ খুব খায়!

অনেকক্ষণ হয়ে গেল! কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না! সামনে দিয়ে দুটো পুলিশের ভ্যান টহল দিতে দিতে চলে গেল! একসাথে এত মানুষের জটলা দেখে প্রথমে একটু থমকে দাঁড়িয়েছিলো! কিন্তু সাংবাদিক আইডি কার্ড দেখেই আবার চলে গেছে! যেন সাংবাদিকদের করোনা হয় না!

বেশ কিছুক্ষণপর একটা লোককে বাঁশ দিয়ে লক করে রাখা গেটের কাছে আসতে দেখা গেল! সব সাংবাদিক এবার একসাথে নড়ে চড়ে উঠলেন! তারপর পজিশন নেয়া শুরু করলেন! ভালো একটা পজিশন নিতে না পারলে তো ছবি বা ভিডিও কোনটাই ভালো আসবে না! ভীড় বেড়ে গেল! শুরু হলো ধাক্কা ধাক্কি! পারলে তারাই বাঁশের গেটের উপর দিয়ে বা তলা দিয়ে লোকটার কাছে চলে যায়!

এত মানুষ ও সাংবাদিক দেখে লোকটা এবার ভয় পেয়ে যায়! মুখটা ঢেকে ঘুরেই সে তার বাসার দিকে দৌড় দেয়! যাতে কেউ তার ছবি তুলতে না পারে! সাংবাদিকরা আবার হতাশ হয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসে! কিন্তু তারা হতাশ হলেও একজন কিন্তু হতাশ হয়না! তিনি হচ্ছেন করোনা ভাইরাস!

লিচু কিনতে আসা দেলোয়ার সাহেবের হাত থেকে ছড়িয়ে পড়া একটি করোনা ভাইরাস লক করে রাখা বাঁশের গেটের একটা বাঁশের উপর মুমূর্ষ অবস্থায় বেঁচে ছিলো! এক সাংবাদিকের হাতের স্পর্শ পেতেই সে যেন প্রাণ ফিরে পেলো! সাংবাদিক সাহেব নাক চুলকালেন, চোখ ডললেন! ভাইরাসটি পৌঁছে গেল তার জায়গামত!

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই করোনা ভাইরাসটি সবার মধ্যেই ছড়িয়ে গেল! সাংবাদিকরা টেরও পেলনা! একটা ভাইরাল ছবি বা ভিডিওর আশায় তারা বাঁশের গেটের সামনে সারাদিন বসে রইলেন! তারা কেউ জানতেও পারলেন না, আর কদিনের মধ্যেই তারা কত ভয়ঙ্কর একটা বাঁশ খেতে যাচ্ছেন!

রেড জোন এলাকা। গভীর রাত। দুপুরে খিচুড়ি আর কালা ভুনা খাওয়ার পর বেশ একটা ঘুম হয়েছে! সামাদ সাহেব উঠে বারান্দায় এলেন! পুরো এলাকায় লকডাউন কঠোর করা হয়েছে! এখন চাইলেও আর নামা যাবে না! পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে! স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে! জরুরি কিছু দরকার হলে তাদের ফোন করলে বাসায় এসে দিয়ে যাচ্ছে! সামাদ সাহেব এলাকার স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন দিলেন!

‘হ্যালো স্বেচ্ছাসেবক ভাই?’
‘জি স্যার বলছি!’
‘আমার একটা জরুরি জিনিস লাগবে? এনে দিবে পারবেন?
‘বলেন স্যার কি জিনিস! আমরা এনে দিবো!’
‘হঠাৎ করে আমার পিঠটা খুব চুলকাচ্ছে! হাতওয়ালা একটা প্ল্যাস্টিকের পিঠ চুলকানি লাগবে! কালো কালারের টা আনবেন! পিংক কালারের পিঠ চুলকানি আমার পছন্দ না!’

***পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।***

Content Protection by DMCA.com
- বিজ্ঞাপন -
- বিজ্ঞাপন -

সর্বশেষ

আরো খবর

- বিজ্ঞাপন -
Content Protection by DMCA.com