ব্লু হোয়েল, ঢোল কলমি, এবং আমাদের সামগ্রিক হুজুগেপনা

সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্লু হোয়েলের মড়ক লেগেছে বলে — ভাবখানা এমন যে হাটে মাঠে ঘাটে সবাইকে নীল তিমির পাগলামি আক্রমণ করছে দিনে রাতে, হাজারে হাজারে লোকজন মারা পড়ছে। এমনকি পড়লাম রাতভর ইন্টারনেটের স্পেশাল প্যাকেজ বন্ধ রাখারও আদেশ এসেছে, পাছে যদি নীল তিমি হানা দেয় রাতের আঁধারে।

ব্লু হোয়েল গেইম আসলে ইন্টারনেটে প্রচলিত একটা মিথ। স্নোপ্স অনুসারে এই গুজবের উৎপত্তি ২০১৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার নিউ গ্যাজেট (নোভা গ্যাজেট) নামের একটি পত্রিকা থেকে। রাশিয়াতে এমনিতেই হতাশাগ্রস্ত টিনেজারদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। এমন একজন উঁচু ভবন থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করার আগে রাশিয়ান সোশাল মিডিয়া সিয়াট ভিকন্ট্যাক্টে ছবি পোস্ট করেছিলো, আর আত্মহত্যাপ্রবণ টিনেজারেরা অনেকেই একই গ্রুপের সদস্য হয়, — এই গুটিকয়েক ঘটনাকে জোড়াতালি দিয়ে রিপোর্ট করা হয় এই ব্লু হোয়েল গেমের ব্যাপারে। বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ কিন্তু মিলেনি। কিন্তু কার কথা কে শোনে — ব্লু হোয়েল গেমের কাহিনীটা চটকদার বলে সারা বিশ্বের ট্যাবলয়েডেরা লুফে নেয় এই গল্প। আবার ইন্টারনেটে এই গল্প পড়ে আত্মহত্যাপ্রবণ টিনেজারেরা অনেকে তিমির ছবি আঁকে হাত কেটে (তারা হয়তো আগে অন্য কিছুর ছবি আঁকতো, এখন হুজুগ বুঝে তিমি আঁকছে)। কিন্তু এরকম কোনো গেইম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, হাজার হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে, এ সবই গাল গল্প মাত্র।

বাংলাদেশে এই হুজুগের শুরুটা ঢাকার এক কিশোরীর দুর্ভাগ্যজনক আত্মহত্যা থেকে শুরু। নানা রিপোর্টে যা পড়লাম, পারিবারিক অশান্তি থেকে অভিমান করে সে আত্মহত্যা করেছে, আর তার পর তার পরিবারের সাথে জড়িত কেউ ব্লু হোয়েলের শিকার বলে চালিয়েছে শুরুতে, কিন্তু তার পরিবার সরাসরি অস্বীকার করেছে এসবের কথা। তার উপরে কোনো প্রমাণ কিন্তু মেলেনি যে এর সাথে অনলাইনের কিছু জড়িত। কিন্তু আবারও কে শোনে কার কথা — গল্প ফাঁদতে ওস্তাদ অনলাইন নিউজ২৪ মার্কা সাইট, এমনকি কিছু মেইনস্ট্রিম পত্রিকা পর্যন্ত এ নিয়ে কল্পনার বল্গাহীন ঘোড়াকে ছেড়ে দিয়েছে, বানাচ্ছে বিশাল গালগল্প। আর ফেইসবুকবাসী জনতার মনে বিশাল আতঙ্ক — ইনবক্সে পরিচিত অনেকেই ভয়াবহ আতঙ্কিত হয়ে একটা চেইন মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছেন, ভাবখানা এমন যে সর্দিকাশি ডেঙ্গুর মতো ব্লু হোয়েল হাজির হয়েছে, এই মারলো বলে!

আরো অদ্ভুত হলো এখন যে কেউ আত্মহত্যা করলেই বিশাল রিপোর্ট আসছে ব্লু হোয়েলের নতুন শিকার বলে। কাল দেখলাম অশিক্ষিত একটি শ্রমিক তরুণের আত্মহত্যাকে উৎসাহী তামাশাপ্রিয় ফেইসবুকীয় জনতা চালাচ্ছে ব্লু হোয়েলের শিকার বলে, যেখানে এই দুর্ভাগা ছেলেটি বাংলা পর্যন্ত লিখতে পারতো না ঠিকভাবে, সে নাকি ইংরেজিতে পাঠানো ব্লু হোয়েলমাস্টারের আদেশ অনুসারে আত্মহত্যা করেছে!! এই কথা যদি আপনি বিশ্বাস করে থাকেন, তাহলে বলতেই হবে আপনার বুদ্ধির লেভেল ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদের চাইতেও জঘন্য।

পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ফেইসবুকীয় জনতার কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে কমন সেন্স, বিচার বুদ্ধি, সুস্থ মস্তিষ্ক — সবটাকেই মনে হয় নির্বাসনে পাঠিয়ে সবাই ফেইসবুকে আসেন, রান্ডম ক্রাপ যা ফেইসবুকে দেখেন, তা গিলেন, বিশ্বাস করেন, এবং জিরো ইন্টারনেটের সুবাদে সমানে শেয়ার করে চলেন।

আমার শৈশবে সেই ৯০ এর দশকে ব্লু হোয়েল ছিলো না, তবে ছিলো ঢোল কলমির ভয়। কেউ একজন নিরীহ এই বেড়া দেয়ার গাছটাকে অপবাদ দিলো, দুর্ধর্ষ এক মানুষখেকো কিংবা বিষাক্ত পোকা এই গাছে থাকে, তার ছোয়া লাগলেই মৃত্যু নিশ্চিত। একাধিক সূত্র কনফার্ম করলো যে এই পোকার কামড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা গেছে (যদিও সবকিছুরই সূত্র “আমি শুনেছি”। তখন অনলাইন ডেস্ক ছিলো না বলে রক্ষা!)। এমনকি এমনও শোনা গেলো, একজন ঢোল কলমি গাছের কাছে যাওয়া মাত্র তাকে পোকায় আক্রমণ করে মেরে ফেললো, আর তাকে বাঁচাতে গিয়ে একে একে আরো জনা ছয়েক মারা গেছে এমন। বলাই বাহুল্য — এই হুজুগে পড়ে দেশের প্রায় অধিকাংশ ঢোল কলমি গাছ কাটা পড়ে বা আগুনে পুড়ে মারা পড়ে। হুজুগ স্থায়ী ছিলো মাস খানেক, পরের হুজুগ আসামাত্র রেহাই পায় ঢোল কলমি গাছগুলা।

ব্লু হোয়েলের হিড়িক দেখে পুরানো সেই হুজুগের কথা মনে পড়লো। আসলে ব্লু হোয়েলের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একটাই উপায় — আগামী হুজুগটাকে জলদি মিডিয়ার নজরে আনা। তিলকে তাল করে তারা যেমন রাশিয়ার এক পত্রিকার ফালতু রিপোর্টকে ধ্রূব সত্য বানিয়েছে, তেমনি আকাশে দুইটি সূর্য, কিংবা হাজার বছর পরে মাসে ৫টি শনিবার হবে এমন টাইপের গুজব ছড়িয়ে দিলে, বা দুনিয়াধ্বংস করে দেয়া উল্কা আসছে ধেয়ে এমন গুজব ছাপতে পারলে পাবলিকের ব্লু হোয়েল আতঙ্কটা কাটবে। ১ দিনও লাগবে না। মনের আনন্দে ফেইসবুকীয় জিরো ইন্টারনেটিয় জনতা বিলাতে থাকবে ভয়ঙ্কর উল্কার ইমেইল বা ইনবক্সের মেসেজ।

হাজার হলেও, লেটেস্ট হুজুগ বলে কথা। তাতে না মাতলে কি আর প্রেস্টিজ থাকে?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। ***

***পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।***

Content Protection by DMCA.com
রাগিব হাসান

রাগিব হাসান

কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. রাগিব হাসান বর্তমানে বার্মিংহামে আলমাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার এবং ইনফরমেশন সায়েন্সেস ডিপার্টমেন্টে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের এনএসএফ / সিআরএ কম্পিউটিং ইনোভেশন ফেলো (সিফ্লো) এবং রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইলিনয়েন্সের আরবানা-শ্যাম্পেইন কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২০১৪ সালে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের নিরাপত্তার ওপর গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থার সম্মানজনক পুরস্কার ‘ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।

আরও পড়ুন...