পীরগঞ্জে ২৯ কোটি টাকার কাজ ১৯ কোটি টাকায়!

পীরগঞ্জে ২৯ কোটি টাকার কাজ ১৯ কোটি টাকায়!
দুর্নীতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, ধ্বসে যাচ্ছে সড়ক!

রংপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে সাদুল্লাপুর-মাদারগঞ্জ-পীরগঞ্জ-নবাবগঞ্জ সড়কের বর্ধিতকরণ ও কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ না হতেই সড়কটির অনেক অংশে ফাঁটল ধরেছে, ধ্বসেও গেছে। সড়কটির টেন্ডারে প্রাক্কলিত মুল্য ছিল প্রায় ২৯ কোটি টাকা। কিন্তু প্রায় ১০ কোটি টাকা কমে ১৯ কোটি টাকায় কাজটি করায় শুরু থেকেই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রংপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ইতিমধ্যেই উল্লেখিত সড়কটির ৮৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়েছে। যদিও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কাজে ঘাপলার ফলে সড়কের বেহালদশা হয়েছে।

রংপুর সওজ সুত্র জানায়, রংপুর সড়ক জোনের অধীনে গাইবান্ধা, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার সাদুল্লাপুর-মাদারগঞ্জ-পীরগঞ্জ-নবাবগঞ্জ সড়কটি আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীতকরণে এডিপি’র অর্থায়নে ২ টি গ্রুপে ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। ১নং গ্রুপে ১ কি.মি. থেকে ২৪ কি.মি. এবং ২নং গ্রুপে ২৪ কি.মি. থেকে ৪৫ দশমিক ৩’শ কি.মি. পর্যন্ত এলাকা বলে জানা গেছে। ওই টেন্ডারে উল্লেখিত সড়কের উভয়পার্শে বর্ধিতকরণ, সাববেজ (খোয়া-বালির মিশ্রণ), বেস্ট টাইপ-১ (পাথর-বালির মিশ্রণ) ও কার্পেটিংয়ের কাজ হওয়ার কথা। ২নং গ্রুপে ২১ দশমিক ৩’শ কি.মি. সড়কের কাজে প্রাক্কলিত মুল্য ছিল প্রায় ২৯ কোটি টাকা। সড়কটির পীরগঞ্জের উজিরপুর থেকে ওয়াজেদ ব্রীজ পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কি.মি. এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত ৭ দশমিক ৮’শ কিমি রয়েছে। সড়কটির উভয়পাশে ৯ কি.মি. বর্ধিত করে মোট ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হবে।

ওই সড়কের দুটি গ্রুপে দাখিলকৃত টেন্ডারে বিধি উপেক্ষা করে ১০ শতাংশের বেশী নিম্নদর দেয়ায় ১নং গ্রুপের টেন্ডার বাতিল করে সেটির রি-টেন্ডার করা হয়েছিল। কিন্তু ২নং গ্রুপে প্রায় ২৩ শতাংশ নিম্ন দরে টেন্ডার দাখিল করা হলেও সেটির রি-টেন্ডার না করে বিশেষ কারণে ময়মনসিংহের মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজকে (সাদল্লাপুর-মাদারগঞ্জ-পীরগঞ্জ-নবাবগঞ্জ সড়কের ২নং গ্রুপে ২৯ কোটি টাকা) কার্যাদেশ দেয়া হয়। এ নিয়ে রংপুরে ঠিকাদারদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজ কাজটির কার্যাদেশ পাওয়ার পর থেকেই নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, কাজে ঘাপলাসহ নানান অনিয়মের আশ্রয় নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে রংপুর সওজ’র তত্ত্বাবধানে ২নং গ্রুপে সড়কটিতে কার্পেটিংয়ের কাজ চললেও মোনাইল মোড়ের পশ্চিমে, ছাতুয়া গ্রামে, টিওরমারী (ভূমি দুস্য মানিক মন্ডলের বিশাল পুকুর সংলগ্ন) অনেক স্থানে সড়কে ধ্বসে গেছে, ফাঁটলও ধরেছে। ওই কাজের ব্যাপারে হরিনা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলালুর রহমান, মোনাইল (জয়নন্দনপুর) শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, ঠিকাদার শুরু থেকেই কাজে ঘাপলা করায় আমরা অভিযোগ করলে ওই ঠিকাদার অফিসের কর্তাবাবুদেরকে ম্যানেজ করে সড়কের কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানায়, ২নং গ্রুপের ২৯ কোটি টাকার কাজটিতে প্রায় ২৩ শতাংশ নিম্নদরের কারণে মোট ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমে ২২ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় কাজটির মুল্য দাঁড়ায়। এরমধ্যে ১৩ শতাংশ টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স বাদ দেয়ায় আরও ২ কোটি ৯০ লাখ ২৯ হাজার টাকা কমে গিয়ে ১৯ কোটি ৪২ লাখ ৭১ হাজার টাকা হয়। প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি টাকা দিয়েই ২৯ কোটি টাকার সমমানের কাজ করতে হবে। এরমধ্যেও রংপুর সওজ এর অফিস খরচ ২ পারসেন্ট রয়েছে বলে সুত্রটি দাবী করেছে। যা উৎকোচ হিসেবে পরিগণিত। ওই উৎকোচের পরিমানও প্রায় ৩৯ লাখ টাকা। এ সব খরচ মিটিয়ে ঠিকাদারকে লাভ কিংবা ২৯ কোটি টাকা সমমানের কাজ সওজ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে হবে বলে সুত্রটি জানিয়েছে। সুত্রটি আরও জানায়, বেস্ট টাইপ-১ কাজের ক্ষেত্রে পাথর এবং বালির মিশ্রনের পরিমাণ ৭ অনুপাত ৩। কিন্তু এর উল্টো অনুপাতে পাথর-বালি মিশ্রন করে সড়কে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাববেজ এর ক্ষেত্রে খোয়া-বালিও ৭ অনুপাত ৩। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ওই অনুপাতের ক্ষেত্রেও উল্টোটা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেইসাথে সড়কের উয়পাশে বর্ধিতকরণের অংশ ভালভাবে রোলারিং না করায় অনেকস্থানে দেবে যাওয়ায় ওইসব স্থানে পানি জমে আছে।

কাজটির তদারকি কর্মকর্তা রংপুর সওজ’র উপসহকারী প্রকৌশলী এখলাস হোসেন জানান, ‘প্রায় ২৩ পারসেন্ট লেস (নিম্নদর), ভ্যাট-ট্যাক্স বাদ দিয়ে ১৯ কোটি টাকায় কাজ হলেও চুক্তি অনুযায়ীই ঠিকাদারকে কাজ করতেই হবে। আমরা যথাযথভাবে কাজ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছি। কাজের মান অবশ্যই ভাল হচ্ছে।’ প্রায় ১০ কোটি টাকা কম হলেও কিভাবে এই কাজ সম্পন্ন করবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারের হয়তো লাভ থাকবে না। তবে এতে কোয়ানটিটি আর কোয়ালিটির ঘাটতি হবে না।’ তিনি আরও বলেন, পিপিআর এর নিয়ম অনুযায়ী সর্বনিম্ন রেসপনসিভ দরদাতাকে কাজ দেয়া হয়। এতে আমাদের করার কিছুই নেই।

রংপুর সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম খান বলেন, আমি শুনেছি, বেশকিছু স্থানে সড়কটি ধ্বসে গেছে। এখনো কাজ চলছে। ঠিকাদার ঠিক করে দিবে। যেভাবেই কাজ হোক, সড়কটির ৩ বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড রয়েছে। এরমধ্যে সড়কের কোন ক্ষতিসাধিত হলে ঠিকাদারকেই মেরামত করে দিতে হবে।

পীরগঞ্জের একজন প্রথম শ্রেনীর ঠিকাদার নাম না প্রকাশের শর্তে পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ২৩ পারসেন্ট লেস আর অন্যান্য খাতের যে খরচ হয়েছে। তাতে ঠিকাদারকে অবশ্যই দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়েছে। যে কাজ হয়েছে, তা বলার মতো না। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার আর ফাঁকি দেয়ায় সড়ক ধ্বসে যাচ্ছে।

—বাংলাদেশ সময়: দুপুর ০১:১৪, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

***পীরগঞ্জ টোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।***

আরও পড়ুন...